বিশ্বের শীর্ষ ধনী জেফ বেজোসের গল্প || জেফ বেজোসের জীবনী

বিশ্বের শীর্ষ ধনী জেফ বেজোস


১৯৯০ দশকে অনলাইনে কেনাকাটা করা তো দূরে থাক, বিষয়টি চিন্তা করাই ছিল অসম্ভব। কিন্তু এই অসম্ভব কাজটি কে সম্ভব করে আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস হয়ে ওঠেন পৃথিবীর শীর্ষ ধনী।


কে এই জেফ বেজোস?

কিভাবে তিনি আমাজন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে হয়ে ওঠেন ই-কমার্স বাদশা?

চলুন এই পর্বে জেফ বেজোস এর জীবনী এবং তার অ্যামাজন প্রতিষ্ঠার পেছনের গল্পটি জানা যাক।


জেফ বেজোসের জীবনী

বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ধনী হলেও বেজোস এর জন্ম সাধারণ পরিবারে।জন্মের সময় তার মা ছিলেন ১৭ বছর বয়সী একজন নাবালিক কলেজছাত্রী। তার জন্মের ১৭ মাস পরেই তার বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তীতে তার মা এক্সন নামক একটি প্রতিষ্ঠানের একজন ইঞ্জিনিয়ারকে বিয়ে করেন এবং সেই সৎ বাবার কাছেই তিনি বড় হন।


ভিন্নকিছু করতে ছোটবেলা থেকেই বেজোস ছিলেন অত্যন্ত উৎসুক।যখন তিনি হাঁটতেও পারতেন না তখন স্ক্রু ড্রাইভার এর ব্যবহারে তিনি তার দোলনার পার্টস খুলে ফেলেন। তার সৎ ভাই যেনো অনুমতি ছাড়া তার রুমে প্রবেশ করতে না পারে তাই তিনি বৈদ্যুতিক দরজার ঘন্টা তৈরি করে ফেলেন।





চতুর্থ শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় প্রথম যখন তার স্কুলে কম্পিউটার আনা হয়, তখন শিক্ষকরাও কম্পিউটার পরিচালনা করতে জানতো না। অথচ বেজোস ম্যানুয়াল পড়ে কম্পিউটার চালিয়ে সবাইকে অবাক করে দেয়। এই প্রতিভাগুলোর জন্য ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটি তাকে সিলভার নাইট পুরস্কার ও জাতীয় মেরিট স্কলারশিপ প্রদান করেন।কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি দীর্ঘদিন ম্যাকডোনাল্ডসে বার্গার তৈরির কাজ করেছেন।


২০০১ সালে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন জীবনে কোনো কাজের অভিজ্ঞতাই বৃথা যায় না। ম্যাকডোনাল্ডসে কাজ করতে গিয়ে আমি শিখেছিলাম কিভাবে বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।উন্নত গ্রাহকসেবা পদ্ধতি ও চাপের মুখে কাজ করা সহ আরো নানা বিষয় সম্পর্কে আমি ম্যাকডোনাল থেকেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম, যা ছিল গতানুগতিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে অনেক ভিন্ন।যে অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তীতে আমার জীবনে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছিল।


বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর তিনি টিশো এন্ড কোম্পানি নামক একটি প্রতিষ্ঠানে অর্থনীতি বিভাগে নিযুক্ত হন।তার উদ্ভাবনী কার্যক্রমের জন্য দ্রুতই তিনি সেই প্রতিষ্ঠানের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হয়ে যান। তখন ১৯৯০ সালের দিকে নতুন নতুন ইন্টারনেটের উদ্ভাবন হয়। তখন শুধুমাত্র সরকারি ও বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেই কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহৃত হতো।


বেজোস তার প্রতিষ্ঠানের হয়ে গবেষণা করতে গিয়ে জানতে পারেন, প্রতিবছর প্রায় ২৩০০ শতাংশ হারে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বৃদ্ধি পাচ্ছে।বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই ইন্টারনেট অনেক বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে যাচ্ছে।

এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নতুন কিছু করার এখনই সঠিক সময়।


তাই তিনি তার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে সেই আকর্ষণীয় চাকরিটি ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি যে কারণে চাকরি ছাড়তে চাইছিলেন তা ছিল সম্পূর্ণ অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তার মা চাকরিটি ছাড়তে বেজোসকে কে বারণ করেছিলেন।তখন বেজোস তার মাকে বলেন, জীবনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি এবং ভবিষ্যতেও করতে পারব। এই নিয়ে চিন্তা নেই তবে আজ যদি নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়নে একবার চেষ্টা না করি তাহলে সারা জীবন আফসোস থেকে যাবে।


তিনি বিনিয়োগের জন্য তার বাবা মায়ের কাছে আর্থিক সহযোগিতা চান। বেজোস এর সৎ বাবা বিষয়টি শোনার পর বেজোস কে প্রশ্ন করেন,"ইন্টারনেট!! এটা আবার কি জিনিস?"


বেজোস এর মা উত্তরে বলেন, আমরা ইন্টারনেটে বিনিয়োগ করছি না,বেজোসের প্রতিভায় বিনিয়োগ করছি।"


তারপর তার বাবা-মা তাদের সঞ্চিত ৩ লক্ষ ডলার অ্যামাজনের 6% মালিকানার বিনিময়ে বেজোসকে দিয়ে দেন।একটি সাক্ষাৎকারে বেজোস বলেছিলেন, "আমি ৭০ শতাংশ নিশ্চিত ছিলাম যে আমি ব্যর্থ হব।"

১৯৯৪ সালে বেজোস তার বাড়ির গ্যারেজে তিনটি কম্পিউটার ও 3 জন সহযোগী নিয়ে অ্যামাজনের যাত্রা শুরু করেন।এভাবেই তিনি সর্বপ্রথম ইন্টারনেটের মাধ্যমে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।


প্রথমে প্রায় ২০ ধরনের ভিন্ন ভিন্ন পণ্যের তালিকা তৈরি করেন এবং সেগুলোর মধ্য থেকে শুধুমাত্র বই দিয়ে যাত্রা শুরু করা সিদ্ধান্ত নেন। আর এভাবেই তিনি অনলাইন বুক স্টোর হিসেবে অ্যামাজনের যাত্রা শুরু করেন। তিনি অ্যামাজন নদীর নামে প্রতিষ্ঠান নামকরণ করেন। কারণ অ্যামাজন হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় নদী। তিনি তার প্রতিষ্ঠানকেও তেমনি বিশাল আকারে পরিণত করতে চাইছিলেন।


১৯৯৫ সালে অনলাইনে অ্যামাজনের যাত্রা শুরু করার মাত্র এক মাসের মধ্যেই আমেরিকার ৫০ টি প্রদেশ ও অন্যান্য ৪৫টি দেশে বেজোস বই বিক্রি করতে সক্ষম হয়।তারপর থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২০,০০০ ডলার সমমূল্যের বই বিক্রি হতে থাকে।প্রথমদিকে ওয়েবসাইটে ম্যানুয়ালি অর্ডার গ্রহণ করা গেলেও সরাসরি ওয়েবসাইট থেকে কেনার কোন পদ্ধতি ছিল না।ওয়েবসাইট থেকে ফোন করে গ্রাহকরা বই অর্ডার করত এবং বেজোস ও তার সহকর্মীরা সেগুলো প্যাকেট করে কুরিয়ার অফিসে পৌঁছে দিত।


পরবর্তীতে বেজোস ও তার সহকর্মীরা মিলে অ্যামাজনের ওয়েবসাইটে সরাসরি পণ্য কেনাকাটা করার প্রযুক্তি যুক্ত করে। যেই প্রযুক্তিটি বর্তমানে বিভিন্ন ই-কমার্স ওয়েবসাইট ও অ্যাপে দেখা যায়। এই প্রযুক্তি সর্বপ্রথম অ্যামাজনই উদ্ভাবন করেছিল। যা আজ বিশ্বজুড়ে কোটি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে। একজন সৃজনশীল ব্যক্তি হিসেবে জেফ বেজোস সর্বদা নতুন নতুন উদ্ভাবন ও তার প্রয়োগ করার চেষ্টা করতেন।তারই ধারাবাহিকতায় তিনি আমাজনে multi-vendor নামে এমন এক প্রযুক্তি যুক্ত করেন যা ই-কমার্স বাণিজ্যকে ভিন্নমাত্রা প্রদান করে।


প্রথম দিকে তিনি একাই অ্যামাজনের পণ্য বিক্রি করলেও পরবর্তীতে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও অ্যামাজনের মাধ্যমে অনলাইনে পণ্য কেনাবেচা করার সুযোগ করে দেন।যার ফলে যে কোনো প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনে বাণিজ্যিক অ্যাকাউন্ট খুলে তাদের পণ্যগুলো লিস্টিং করার মাধ্যমে অনলাইনে বিক্রয় করতে সক্ষম হয়।এতে প্রায় সকল ধরনের প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনে তাদের পণ্যগুলো লিস্টিং করতে শুরু করে।


ফলে বইয়ের পাশাপাশি প্রায় সকল ধরনের পণ্য একই ওয়েবসাইট থেকে গ্রাহকরা ক্রয় করার সুযোগ পায়।এভাবে বিশ্বজুড়ে ক্রেতাদের পাশাপাশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও অ্যামাজন হয়ে ওঠে অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি মার্কেটপ্লেস।১৯৯৭ সালে বেজোস অ্যামাজনের পাবলিক শেয়ার অফার করার মাধ্যমে শেয়ার বাজারে প্রবেশ করে।


যার প্রতিটি শেয়ারের বাজার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২৯ ডলার। ২০০০ সালের দিকে অ্যামাজন একটি বিলিয়ন ডলার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বেজোস তো বিলিয়নিয়ার হনই, তার সাথে তার বাবা-মাও প্রতিষ্ঠানের 6% মালিকানার সাথে বিলিয়নিয়ার হয়ে যান।


পরবর্তীতে অ্যামাজন বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানকে কিনে নেয়ার মাধ্যমে বিশাল আকার ধারণ করে। ঠিক অ্যামাজন নদীর মত। বর্তমানে জনপ্রিয় পত্রিকা দ্যা ওয়াশিংটন পোস্ট, অ্যামাজন প্রাইম, অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস,ব্লু অরিজিন সহ বর্তমানে শীর্ষ স্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিক জেফ বেজোস। বিল গেটসকে ছাড়িয়ে ১৫০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করার মাধ্যমে জেফ বেজোস পৃথিবীর শীর্ষ ধনীর খেতাব অর্জন করেন। তার সফলতা বিশ্বব্যাপী মানুষকে উৎসাহিত করেছে এবং এখনো করছে।


বর্তমানে অ্যামাজন ছাড়াও কোটি অনলাইন শপ রয়েছে যার মাধ্যমে মানুষ সফলভাবে বাণিজ্য পরিচালনা করার মাধ্যমে আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।


♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️


এই ছিল বর্তমান বিশ্বের শীর্ষ ধনী জেফ বেজোসের সংক্ষিপ্ত জীবনী।এই পর্বে‌ এতোটুকুই। পরবর্তী পর্বে শীঘ্রই আবার কথা হবে নতুন কোনো বিষয় নিয়ে। ততক্ষণ পর্যন্ত সবাই ভালো থাকবেন,সুস্থ থাকবেন, কমেন্ট বক্সে আপনার মতামত অবশ্যই জানাবেন।

ধন্যবাদ।

0 Comments

Post a Comment

Post a Comment (0)

Previous Post Next Post